কেউ ধর্ষণের শিকার হলে ন্যায়বিচার পেতে কি করণীয়?

আপন জুয়েলার্স এর মালিকের ছেলেসহ তিনজন মিলে ধর্ষনের অভিযোগটি নিয়ে সামাজিক মিডিয়ায় যথেষ্ট হইচই হচ্ছে| কিন্তু আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে কোনো ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ দিয়ে কাউকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই দোষী সাবস্ত্যকরণ মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোর পরিপন্থী, এবং এর দ্বারা আদালতে ন্যায়বিচারও পাওয়া যায় না| কারণ আদালত শুধুমাত্র বাদী-বিবাদীর যুক্তিতর্কের মাধ্যমে উথাপিত তথ্য, প্রমান, আলামত এর ওপর নির্ভরশীল| দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে যদি আপন জুয়েলার্স এর মালিকের ছেলেসহ তিনজন মিলে সত্যই ধর্ষণ করে থাকে, তাহলেও তা বিচারিক আদালতে প্রমান করা দুরুহ হবে। যেহেতু ইতিমধ্যেই প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেছে, সেহেতু গুরুত্বপূর্ণ আলামত যেমন কাপড় চোপড়ে বীর্য, ধর্ষণের স্থলে বিভিন্ন জায়গায় লেগে থাকা বীর্য, শরীরে আঘাতের চিহ্ন, বল প্রয়োগের চিহ্ন এর উপস্থিতি, চুল, ত্বক, লালাসহ ধর্ষণ যেখানে হয়েছে সেই রুমের বিভিন্ন আলামত এতদিন থাকার কথা না| অতএব ইতিমধ্যেই, মামলার অধিকাংশ আলামত বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে!

অতএব ভবিষ্যতে কেউ যদি এ ধরনের নারকীয় ঘটনার শিকার হন, তাহলে তার উচিত হবে অবিলম্বে ঘটনার পর পরই গোসল না করে কাপড় চোপড়গুলো একটা কাগজের ব্যাগে (পলিথিন জাতীয় ব্যাগে নয় কিন্তু) নিয়ে সঙ্গীসহ (স্বজন/আত্মীয়/বন্ধুবান্ধব) আপনার নিকটস্থ বাংলাদেশ পুলিশের ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার’ অথবা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অন্তর্গত জেলা/সদর হাসপাতালের ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে’ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানাই। সেটি সম্ভব না হলে পুলিশ থানায় যেতে হবে| সেই সাথে সম্ভব হলে এটাও খেয়াল রাখুন যে ধর্ষণের স্থলে কেউ যেনো আলামত গোপন না করতে পারে| পুলিশ মামলা না নিলে সরাসরি আদালতে হাজির হয়ে কোনো আইনজীবী দ্বারা মামলার আবেদন করতে হবে, তখন আদালতই পুলিশকে নির্দেশ দিবে মামলা ফাইল করতে| আপনার যদি আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকে, তাহলে প্রতিটি জেলা আদালতে অবস্থিত ‘জেলা লিগ্যাল এইড’ অফিস থেকে বিনামূল্যে সরকারী আইনজীবীর সাহায্য নিন| যদি জীবনের আশংকা থকে, অথবা যদি বিচারিক আদালত পর্যন্ত যাওয়াটা কঠিন হয়, সেক্ষেত্রে আপনার এলাকার সৎ রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী, মিডিয়া এবং এ নিয়ে কাজ করা এনজিও গুলোকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা করুন| বিশেষ করে মনে রাখবেন যে কোনো ধর্ষণের মামলার আলামত সংগ্রহে প্রথম ২৪ ঘন্টা খুব খুব খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেলে বায়োলজিক্যাল আলামতগুলোর (যেমন বীর্য,লালা) বেশিরভাগই নস্ট হয়ে যায় (যদিও আজকাল সনাক্তকরণের আরও উন্নত প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু আমাদের পুলিশের ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ বিভাগের সক্ষমতা কতটুকু সেটি প্রশ্নবিধ্ব!)| আর আপনি পুলিশকে না জানিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে খুব বেশি লাভ নেই, কারণ তারা আপনাকে ট্রিটমেন্ট দিবে, কিন্তু পুলিশ মামলা/ আদালতের নির্দেশ ছাড়া আদালতে উপস্থাপনের উপযোগী কোনো মেডিক্যাল সার্টিফিকেট সাধারনত দিবে না|

মনে রাখবেন, ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিলম্বে মামলা দায়ের করা (অথবা বিলম্বে আইনের সাহায্য নেওয়া) মানেই আপনার ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা কমে যাওয়া| আর আপনি ন্যায়বিচার না পাওয়া মানে হচ্ছে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়া যা ভবিষ্যতে অন্য কাউকে ঝুঁকিতে ফেলে দিবে|

জনস্বার্থে
সাইমুম রেজা পিয়াস
এডভোকেট, জজ কোর্ট, ঢাকা

Print Friendly, PDF & Email
piash2003@gmail.com'

Saimum Reza Piash

Teacher at East West University, Bangladesh, Youth for Human Rights International Bangladesh and Bangladesh Study Forum ।। BDSF Past: Transparency International Bangladesh (TIB) and Bishwo Shahitto Kendro [বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র]

You may also like...

error: Content is protected !!