তথ্য অধিকার আইন জনগণ কি রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব জানতে পারবে?

২০০৯ সালে দেশে তথ্য অধিকার আইন প্রনীত হয়েছে। এ আইনের কার্যকর প্রয়োগের ফলে তথ্য দাতা ও তথ্য গ্রহীতার মাঝে একটি নিবিড় যোগাযোগের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে দুর্নীতি কমে আসবে, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটবে। সর্বোপরি গোপনীয়তার সংস্কৃতির পরিবর্তে একটি উদার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিনির্মাণে তথ্য অধিকার আইন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

তথ্য অধিকার আইন নিয়ে দেশের গণমাধ্যমকর্মী, সুশীলসমাজ, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষসহ সাধারণ জনগণের এ রকম একটা প্রত্যাশা ছিল।

কিন্তু গত ৫ বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে সফলতার দিকটি সেভাবে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের সহজপ্রাপ্যতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর করে। কিন্তু আধুনিক ক্ষমতা কাঠামোর বিন্যাস এবং এর নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কারণেই সাধারণের তথ্য জানা বা তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্র সীমিত করে রাখে।

মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অগ্রগমন এবং সমাজে সুশাসন উন্নততর করার জন্য সমাজের সর্বস্তরে প্রয়োজনীয় তথ্যের আদার প্রদান উল্লেখযোগ্যহারে বাড়াতে হবে। যথাযথ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য থাকলে মানুষের প্রচেষ্টাগুলোও সহজতর হয়।

শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও কৃষক-শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগুচ্ছে। শিক্ষিত, বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল, আত্মনির্ভরশীল মানসিকতাসম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে যারা দেশকে নতুন ধ্যান ধারনায় এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখছে।

কিন্তু বহুদিন ধরে চলা রাজনৈতিক সংস্কৃতি এ অগ্রগমনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু সংখ্যক রাজনৈতিক নেতা দেশকে এগিয়ে নিতে ব্যক্তিগতভাবে সচেষ্ট হলেও রাজনৈতিক দলগুলো জনকল্যাণমূলক রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতির বৃত্তে বন্দী হয়ে গেছে। দলীয় রাজনীতির অচলায়ন চাইলেও ভাঙতে পারছেন না জনকল্যাণকামী রাজনীতিবিদগণ।

সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির পরিবর্তে ছলে বলে কৌশলে যেভাবেই হোক নির্বাচনে জিততে চায় দলগুলো। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। ক্ষমতায় গিয়ে বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে অনুগতদের সুবিধা দেয়ায় মনোযোগী হয়।

বিরোধী দলে থাকলে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার বিপরীতে সংসদ বর্জন এবং রাস্তার আন্দোলনকে কৌশল হিসেবে বেছে নেয় যদিও জনগণ সংসদে তাদের গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করে। অন্যদিকে ক্ষমতায় যেতে না পারার ভীতিও তাদের পেয়ে বসে।

ক্ষমতায় যেতে না পারলে পরবর্তী ৫ বছর হামলা মামলার শিকার হয়। তাই ’ক্ষমতানীতি’ই হয়ে উঠেছে রাজনীতি। ক্ষমতানীতির দুষ্টচক্র তথা এ হীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে মুক্তির জন্য চাই জবাবদিহিতামূলক সরকার ব্যবস্থা। জবাবদিহিতার জন্য চাই অবাধ উন্মক্ততা; রাখঢাকহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা অর্থাৎ গোপনীয়তার বাতাবরণমুক্ত শাসনকাঠামো।

সরকারগুলো নিজ থেকে এ উদ্যোগ নেয় না কারন তারা গোপনীয়তার বাতাবরনে ক্ষমতা কুক্ষীগত করে রাখতে চায়, আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। উন্মক্ততার সংস্কৃতির পরিবর্তে তাই গোপনীয়তার সংস্কৃতিই কাক্সিক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে।

গোপনীয়তার সংস্কৃতির বাতাবরণ ভাঙ্গার উদ্যোগ সমাজের সচেতন নাগরিক সমাজকেই নিতে হবে। ভোট দিয়ে একদিনের গণতন্ত্র চর্চা করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আমরা কাকে নির্বাচিত করছি তা দেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

আমাদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ ঠিকমতো তার দায়িত্ব পালন করছে কি না, তাও আমাদের দেখতে হবে। জনকল্যানে কাজ করলে তাকে উৎসাহিত করতে হবে এবং মন্দ কাজ করলে তার প্রতিবাদ করতে হবে।

প্রয়োজনে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ সচেতন, সংগঠিত ও সোচ্চার জনগোষ্ঠীই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। অতীতে আমরা যখনই ঐক্যবদ্ধ হয়েছি এবং ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছি তখনই আমরা জয়লাভ করেছি।

তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা তা করতে পারি। সম্প্রতি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ইতিবাচক উদাহরণ আমাদের সামনে হাজির করেছে। দীর্ঘদিন থেকেই নির্বাচন কমিশনের কাছে রাজনৈতিক দলসমূহের বছরভিত্তিক আয়-ব্যয় বিবরণী চেয়ে আসছিলো নাগরিক সংগঠন ’সুজন’।

সর্বশেষ গত ৬ জুন ২০১৩ নির্ধারিত ফরমে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে তথ্য চেয়ে ’সুজন’ আবেদন করে। গত ১৪ জুলাই ২০১৩ তারিখে ’নির্বাচন কমিশনে জমাকৃত রাজনৈতিক দলের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব (অডিট রিপোর্ট) নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব তথ্য নয়’ বলে তা রাজনৈতিক দলের নিকট থেকে সংগ্রহ করার জন্য সুজনকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও ৪ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করে সুজন।

আপিলেও নির্বাচন কমিশন একই সিদ্ধান্ত বহাল রেখে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ’সুজন’র কাছে পত্র প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তথ্য সরবরাহ না করার জন্য ’সুজন’ এর পক্ষ থেকে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হলে, ২২ অক্টোবর ২০১৩ শুনানীর দিন ধার্য্য করা হয়।

শুনানিকালে কমিশন বলেন, ’যখনই কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের কাছে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল করেন, তখনই সেটা ’পাবলিক ডকুমেন্ট’ হয়ে যায়। ফলে তখন তা প্রকাশে কোনো আইনগত বাধা থাকে না। এটা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও থাকা উচিত।

শুনানি শেষে তথ্য কমিশনের পক্ষ থেকে নিম্নবর্ণিত নির্দেশনাসমূহ দেয়া হয়: ’সুজন’ নির্ধারিত ফরমে সুনির্দিষ্টভাবে (কোন কোন রাজনৈতিক দলের, কোন কোন সময়ের তথ্য) তথ্য চেয়ে আবেদন করবে; নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে ’সুজন’কে তথ্য সরবরাহের ব্যাপারে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠাবেন; সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহ তথ্য সরবরাহে সম্মত হলে অথবা ৫ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত প্রদাণ না করলে কমিশন যত দ্রুত সম্ভব ’সুজন’কে তথ্য সরবরাহ করবে; কোনো রাজনৈতিক দল তথ্য প্রদানে অসম্মত হলে তা লিখিতভাবে ’সুজন’কে জানাবে কমিশন।

পাবলিক ডকুমেন্ট হিসেবে রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের বিবরণী ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা উচিত – নির্বাচন কমিশনের এ মন্তব্য আমাদের আশ্বস্ত করে আমরা সচেষ্ট হলে গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্ত করা সম্ভব।

নাগরিক সংগঠনগুলো পরিকল্পিতভাবে একক এবং দলবদ্ধভাবে এ প্রচেষ্টায় উদ্যোগী হলে তথ্য অধিকার আইনটি কাজে লাগিয়ে আমাদের জনসাধারণের পথের বাধাগুলো আমরা সরিয়ে দিতে পারবো।

লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর (গভর্ন্যান্স), দি হাঙ্গার প্রজেক্ট, বাংলাদেশ ও সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক; ইমেইল:saifahmed71@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Law Help Bangladesh

This is a common profile to post random articles form net and other sources, generally we provide original author's information if found, but some times we might miss. Please inform us if we missed any or if you are aggrieved on any post, we will remove or re-post it with your permission.

You may also like...

error: Content is protected !!