তনু, কন্সপাইরেসি থিওরি ও আমরা

তনু হত্যা, যেহেতু প্রমাণ নেই অপমৃত্যুও বলা যেতে পারে; আরেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র,  আর এমন ঘটনা গুলোর সমষ্টিই পরিশেষে পরিসংখ্যান হয়ে আমাদের বিস্মিত করে। তবে তার থেকেও বিস্ময়কর মৃত্যুকে নিয়ে বাণিজ্য করা। বেচারি মরতে না মরতেই একদল তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে সঙ্গে ধর্মের হাওয়া লাগাতে তার অর্ধ-উলঙ্গ (মিথ্যে) ছবিও ছড়ায়।

এরই মধ্যে এক দল সেনাবাহীনি ধুয়ে দেয়; এর পেছনে আমাদের সেনাবাহীনি প্রীতি ও ভীতি দুইই কাজ করে, আমার তাদের শৃঙ্খলিত ভাবতে পছন্দ করি, তাদের উপর নির্ভর করি, আবার তাদের সীমাহীন ক্ষমতা ও বাণিজ্য আমাদের ভয়ও পাইয়ে দেয়, সেই ভয়ে যখন আমরা অস্থিরতার সাথে দিন গুনছি তখনি কেউ কেউ আবেগের যায়গা নিয়ে খেলে রাজনীতির মাঠে বাজিমাত করতে চায়। তারা সুকৌশলে নতুন তত্ত্বের প্রসব করে, আর আমরা নতুনকে পেয়ে খানিকটা ইতস্তত করে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাই, ঠিক যেমন চিল নিয়েছে কানের মত ব্যাপারটা।

তত্ত্ব এ কারণে বলছি যেহেতু বিষয়টা প্রমাণিত না, বলছিনা এ তত্ত্ব সত্য বা মিথ্যে, এমন তত্ত্ব গুলোকে বলা হয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (Conspiracy theory) একটু ভেঙ্গে বলতে গেলে; কোন ঘটনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা মূলক অনুমান, যা যে কোন একাধিক ব্যাক্তি বা সংস্থা মিলে কোন বিশেষ স্বার্থ রক্ষায় গোপনে ও সু-পরিকল্পিত ভাবে করা হয়।

এই ধরনের তত্ত্ব মূলত তিনটি নীতির বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে টিকে থাকে ১. কোন কিছুই দুর্ঘটনা না, ২. যেমনটা দেখায় প্রকৃত ঘটনা তেমনটা না ৩. একটি সাথে আরেটি ঘটনা সর্বদা সম্পর্ক যুক্ত।

মানুষ যখন কোন ব্যাখ্যা খুঁজে না পায় তখন সে অনেক সময় অপব্যাখ্যাকে ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নিতে পছন্দ করে,মানুষে জ্ঞানী হবার প্রবৃত্তি এবং যেহেতু সহজে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না তাই এই অপব্যাখ্যা গুলো সহজই ছড়িয়ে যায় ও যুক্তি হিসেবে স্থান করে নেয়।

সমস্যা হল এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সাধারণত উদ্দেশ্য মূলক ভাবে তৈরি করা হয় (objectively), এবং স্বাভাবিক ভাবে কোন ঘটনা ঘটার পর এ তত্ত্ব প্রকাশ করা হয় যা এর অন্যতম দুর্বলতা। যেখানে যুক্তির চেয়ে বিশ্বাসকে বেশী প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং সেই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতেই সকল যুক্তি দেয়া হয়।

এ ধরনের তত্ত্বে সাধারণ কোন সত্যি ঘটনা ঘটার পর পর, পূর্বের কিছু সত্যের সংমিশ্রণে ও কিছু অনুমান নির্ভর কর তথ্য ঢুকিয়ে উদ্দেশ্য মূলক ভাবে কেউ কোন উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করে কেউ কাজটি করেছে বলে প্রমাণ করা হয় এবং যখন তারা (যাদের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ) কোন ব্যাখ্যা দিতে চায় তাকে অপপ্রচার বলে ধারনা করা হয়, অন্যদিকে তত্ত্ব প্রকাশকারী গন যখন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন তখন তারা সেটা অপর পক্ষের গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে তা সম্ভব নয় বলে ব্যক্ত করেন। তবে সাধারণত কিছু যুক্তি থাকে যা দেখে এই সব তত্ত্ব সম্পর্কে কিছুটা হলেও আস্থা আসে। কিন্তু বাঙ্গালী কি আর যুক্তির ধার ধারে, আবেগের তোড়ে  আর অন্ধ বিশ্বাসে চাঁদে মুখ দেখে মানুষ পর্যন্ত খুন করে ফেলে। সে যাই হোক এমন সব তত্ত্বের বেলায় যদি তা সত্য হয় সত্য প্রমাণের জন্য কছু না কিছু পাওয়াই যায়।

বলছিনা এ তত্ত্ব গুলো একেবারেই মিথ্যা, এমন হাজারো তত্ত্ব সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে যা নানা সময়ে পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছে তবে তার চেয়ে অনেক বেশী আজও আশার আলো খুঁজে পায় নি, হতে পারে তা সেই ষড়যন্ত্রের প্রভাবে চাপা পরা, হতে পারে আসলেই তেমন কিছু হয়নি শুধুমাত্র ভ্রান্ত কল্পনা।

আমাদের সমাজে এখন চলছে তনু তত্ত্ব, সেনাবাহীনি থেকে সরকার, সরকার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক হ্যাকিং কি নেই! আমি এর পক্ষেও বলব না বিপক্ষেও বলবো না হয়তো আমি ততটা যোগ্য নই, তবে যোগ সূত্রে সুধু প্রস্তাবনামূলক যুক্তি-ই (inductive reasoning) খুঁজে পেলাম যা কেবলমাত্র সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।

তবে এতটুকু তো প্রমাণিত যে তনুর অপমৃত্যু হয়েছে, এতোটুকু তো প্রমাণিত এখন বিচার হয় নি, সেই সেই সত্যের জন্য লড়তে দোষ কোথায়? কিছু বিবেচক মানুষ যখন বর্তমান সত্যকে উপেক্ষা করে সেই সব তত্ত্বকে সত্য ধরে পিছিয়ে পড়ে তখন খারাপ লাগে।

ধরলাম সব সরকার করেছে, তার ব্যর্থতা ঢাকার জন্য, তাই বলে কি আমারা নিরাশ হয়ে বসে থাকবো? কেন আমাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে! যখন কান টানলে মাথা আসে আমাদের কান ধরতেই বাধা দেওয়া হচ্ছে কেন! কারা? কি কারণে? তারা কি এতটাই বোকা যে এই সত্য বোঝে না। হতাশার ক্লান্তি মানে ঢুকে গেলে সর্গেও শান্তি নেই, মর্ত্তে তো বাচাই বৃথা তবু কেন আমারা আগাম হতাশ?

তনুর বিচারে দেশ যখন একত্রিত হচ্ছে তখনি এমন সব হতাশার কথা আমাদের ভিতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে, বিন্দু বিন্দু সদিচ্ছা যখন এক হচ্ছে তখন তাকে মহাসাগর দেখিয়ে ছোট করা হচ্ছে। যখন দেশে বিপ্লব দরকার, যখন আমরা সকল বিষয়ে সর্বদা বিভক্ত তখন আমাদের এই যৌক্তিক বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা কতটা যৌক্তিক? যখন এক তনু মাধ্যমে মাইল ফলক হতে পারত তখনে সে পথ যাত্রীদের যাত্রায়ই যদি বাধা দেওয়া হয় তবে পথের সৃষ্টি হবে কিভাবে?

আমরা ঐক্য চাই; তবু বিভক্তি তৈরি করি। জনাব, এক সাথে বসে এক মাতের মাঝেও বিরোধ করা যায়, হাজার বিষয় পড়ে থাকতে কেন এমন বিষয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সমাজকে বিশৃঙ্খল করা হচ্ছে? কেন আমরা পথচ্যুত হচ্ছি। বলবেন হয়তো “কি হয়েছে? আগের অমুক তামুক তো বিচার পায় নি” প্রশ্ন হলে আগামী কাল আরেকজন মরা গেলেও তো আপনি এই ঘটনার রেফারেন্স টানবেন আর ভুলে যাবেন সেখানে দায় আপনারও ছিল।

বিষয়টি সুধু সেনাবাহীর না, সুধু তনুর না, সুধু ধর্ষণের না জাগতে হবে সামগ্রিক ভাবে প্রতিটা অন্যায়ে, আমি আজ লিখছি কারণ একা জাগা সম্ভব না, কোন লাভ নেই একা জেগে, যখন দেখি সবাই জাগছে কিন্তু কিছু কারণে বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে তখন কিছু দায়িত্ব বর্তায় বৈকি।

তনু আমার কেউ না, সে দেশের নাগরিক, আমি এই দেশের নাগরিক আমাদের অধিকার আজ হাস্যকর শব্দে পরিণত হয়েছে আমি সেই অধিকাররে পক্ষে লড়তে চাই, আমার জন্য, আমাদের জন্য লড়তে চাই তনুর জন্য নয়।

এক দিনে কিছু হয়নি একদিন পরিবর্তন সম্ভব নয় তবে এইসব ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে যখন পথ ভ্রষ্ট করা হচ্ছে কার কি উপকার হচ্ছে তা মালুম করা বড় দুষ্কর। আজ আপনি আপনার সন্তানকে হতাশ করছেন, সে ব্যথা পাবে ভয় করছেন কাল আপনার মৃত্যুতে সমাজ একই ভয়ে অস্থির থাকবে, নতুন প্রজন্মের চেষ্টাকে স্বগত জানান, ভুল হতেই পারে কিন্তু তাদের চেষ্টাকে নিচু চোখে দেখে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করবেন না।

ধন্যবাদ।
শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

Print Friendly, PDF & Email

Rayhanul Islam

The author is an original thinker; often challenges the regular rule of conduct considering various perspective on the basis of scientific reasoning to ensure the peace and prosperity of the society. He works as freelancer advocate and promote legal knowledge and human right concept to the root level. The author is also a tech enthusiast and web developer, he loves psychology as well.

You may also like...

error: Content is protected !!