বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ জরুরি

যে কারো দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হতে পারে বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগ কাজ করবে ভয় কিংবা পক্ষপাতহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে, থাকবে জবাবদিহিতার স্বাধীনতা। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন সত্যিকার অর্থেই নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকভাবে কাজ করতে পারবে।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের জন্য ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম পদক্ষেপটি নিতে সময় লেগেছে প্রায় দশ বছর। ২০০৯ সালের শুরুতে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রাথমিক কাজটি পুনরায় গতি পায়। বর্তমান সরকার এর মাধ্যমে রাজনৈতিক অভিপ্রায় প্রতিপাদনের চেষ্টা করেছে।

আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২ এ (দ্বিতীয় ভাগ, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মূল ভিত্তি সন্নিবেশিত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের নির্বাহী অংগসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন” I তবে এই অনুচ্ছেদের দুর্বলতা এর মধ্যেই নিহিত। কেননা সংবিধানের ৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ২য় ভাগে বর্ণিত নীতিসমূহ আদালত কর্তৃক বলবেযাগ্য নয়।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো আনুক্রমিক সরকারের অনীহা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। দলীয় স্বার্থেই রাজনৈতিক সরকার এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে গড়িমসি করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি হলেও সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ বলে সরকারের কাজে সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

কর্মধারা অত্যন্ত ধীরগতিতে এগুলেও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং সুপ্রিম কোর্টের অদম্য প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ফল হিসেবে আমরা নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক বিচার বিভাগ পেয়েছি। অধস্তন আদালতের বিচারপতিদের সাথে নিয়ে সহকারী বিচারপতি মাজদার হুসেইন হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করলে প্রক্রিয়াটি গতি পায়। মামলাটি “মাজদার হুসেইন মামলা” নামেই সমধিক পরিচিত। এই ইস্যুতে পরবর্তী সকল আইনগত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মামলাটি মূল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এরকম একটি জটিল বিষয়ের পরবর্তী বিবেচনায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে) এবং অনুচ্ছেদ ২৯-এর (সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা) স্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেননা অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত বিতর্কিত নির্দেশনার কারণে মামলার বাদিগণ বিচার বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের মৌলিক অধিকারহানির আশঙ্কা করেন। আবেদনে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে যে কোন চাকরির পদ কিংবা চাকরি, সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২-এর উল্লেখ করা হয়। এতে “বিচার কর্মবিভাগ” অর্থ জেলা-বিচারক-পদের অনূর্ধ্ব কোন বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের লইয়া গঠিত কর্মবিভাগরূপে তা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার ওপর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ভিন্নমত পোষণ করা হয়েছে।

কাছাকাছি বেশকিছু বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় ছিল বিতর্কিত। বাদিগণ বিচারের ক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৪ থেকে ১১৭ (বিশেষভাবে অনুচ্ছেদ ১১৪ থেকে ১১৬) “অধস্তন আদালত”-এর মধ্য সন্নিবেশিত বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয়) অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। চতুর্থ ভাগের চতুর্থ পরিচ্ছেদের অনুচ্ছেদ ৬১ থেকে ৬৩, এ দুটি অনুচ্ছেদ সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার বলে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

হাইকোর্ট আবেদনকারীদের কৈফিয়ত গ্রহণ করেছে এবং আবেদন মঞ্জুর করেছে। ১৯৯৯ সালে তত্কালীন সরকার হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণের অনুকূলে স্থির সিদ্ধান্ত নিতে আপিল বিভাগের বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছে। বিচার কর্মবিভাগ যদিও প্রজাতন্ত্রেরই কর্মবিভাগ, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এটি বৈশিষ্ট্যগুণে অন্য বিভাগগুলো থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও সহজে চিহ্নিতকরণযোগ্য। এও স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সংবিধানের অনুছেদ ১৩৩ বা ১৩৬ দ্বারা নয়, বরং অনুচ্ছেদ ১১৫ বলে গঠিত নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হবে। ১৯৭৫ সালের চাকরি আইন এবং ১৯৮১ সালের কর্মকমিশন নিয়োগ বিধি বিচারপতিদের সম্পর্কে প্রয়োগযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদের সাথে সংগতি রেখে বিচার বিভাগের যথার্থ পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রসঙ্গে নির্দেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ। এ প্রসঙ্গে সরকারকে আরো বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে; (ক) কর্মস্থল নির্ধারণ, অব্যাহতি, শৃংখলা (বরখাস্ত ও অপসারণ ব্যতীত), বেতন, ভাতা, পেনশন ও অন্য শর্তাবলীর সাথে সংগতি রেখে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৩ অনুযায়ী বিধি/আইন/নির্দেশ তৈরি এবং অবশ্যই তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ ও ১১৬(ক)-এর ভাবধারার সাথে সংগতিপূর্ণ হবে; (খ) বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য পদমর্যাদা রক্ষার জন্য একটি জুডিসিয়াল পে কমিশন গঠন; (গ) বিচার বিভাগে কর্মকালের স্থায়িত্বের নিরাপত্তা, বেতনের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা; সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৩ অনুযায়ী গঠিত বিধি/নির্দেশ বলে সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা বজায় থাকবে বলে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়। (ঘ) অন্য সকল ক্যাডার পদের ন্যায় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সকল সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি; (ঙ) শুধুমাত্র বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের উপর প্রয়োগযোগ্য প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করার জন্য একটি জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন এবং একটি জুডিসিয়াল পে কমিশন গঠন করতে বলা হয়েছে। এতে (ক) বাংলাদেশ কর্মকমিশন (জুডিসিয়াল) থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চিহ্নিতকরণযোগ্য বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন এবং (খ) আপিল বিভাগের বিচারপতি দ্বারা পরিচালিত একটি জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠনের জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ প্রসঙ্গে সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচারপতি নিয়োগদানের ক্ষেত্রে কোন বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই কমিশন নিম্ন আদালতের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

একটি সত্যিকারের স্বাধীন এবং পৃথক বিচার বিভাগ গঠনের জন্য নানা বাধা-বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও সকল প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে নির্বাহী বিভাগের অনমনীয়তা প্রতিফলিত হয়েছে। শাসন বিভাগের অন্যান্য শাখার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগুতে হবে। একই সাথে দ্বিধা ও আপোষের মানসিকতা পোষণ করা যাবে না। তদুপরি এতে রাজনৈতিকীকরণের ছায়া যেন পতিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকার, বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ক্যাবিনেট বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তাদের যথাযথ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে পারে, যাতে এর গতি কখনো ব্যাহত না হয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে জনকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। সেটা মূলত প্রয়োজন সংবিধান, নিয়োগ দান, অব্যাহতি, পদচ্যুতি, অপসারণ, কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, নিয়ন্ত্রণ, শৃংখলাসহ অন্যান সংশ্লিষ্ট চাকরির শর্তাবলীর মতো প্রশাসনিক বিষয়গুলো গভীরভাবে নিরীক্ষণের জন্য। আমাদের প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল ১৯৯৮ সালে ফৌজদারি কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনীর সাথে সংগতি রাখা। এটা অবশ্যই সন্তোষজনক হওয়া জরুরি।

পৃথক বিচার বিভাগ গঠনের চিন্তার সাথে আমি আমার পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। এটি সফল হলে নিঃসন্দেহে বেশকিছু অমীমাংসিত কাজের সমাধান অদূর ভবিষ্যতে সহজ হবে। এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশকিছু বিতর্কিত ইস্যু উদ্ভূত হতে পারে। এতদসত্ত্বেও প্রক্রিয়া শুরু করতে বিলম্ব করা উচিত নয়। দৃঢ সংকল্প এবং নমনীয়তা হবে মূল নির্দেশক। এই নতুন ছাঁচ তৈরি হবে অবশ্যই ২০০ জনের বেশি বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে। সংশোধিত সি আর পি সি অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো জেলার সেশন জজ আদালতের কাছে হস্তান্তরিত হবে এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো জেলা প্রধান বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হস্তান্তরিত হবে। হস্তান্তরিত মামলা প্রধান বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট মীমাংসা করে অতিরিক্ত সেশন জজ আদালত বা বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যথাযোগ্যভাবে হস্তান্তর করবেন।

মোহাম্মদ জমির
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
ভাষান্তর : আকলিমা জান্নাত আরজু

Print Friendly, PDF & Email

Law Help Bangladesh

This is a common profile to post random articles form net and other sources, generally we provide original author's information if found, but some times we might miss. Please inform us if we missed any or if you are aggrieved on any post, we will remove or re-post it with your permission.

You may also like...

error: Content is protected !!