ঝুলে আছে ২৪ হাজার ‘রাজস্ব মামলা’

নিষ্পত্তিতে ধীরগতির কারণে মামলার জট লেগেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআরে)। রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এনবিআরের অধীনে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্ক-সংক্রান্ত প্রায় ২৪ হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে। বছরের পর বছর পুঞ্জীভূত এসব মামলার সঙ্গে রাজস্ব আয় আটকে রয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।

মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এনবিআরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সর্বাত্মক চেষ্টা নেওয়ার পরও কার্যত কোনো ভালো ফল আসেনি। মূলত, রাজস্ব ফাঁকি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে করদাতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরেই এসব মামলা করেছেন সংক্ষুব্ধরা। ঝুলে থাকা মামলার নব্বই ভাগ হাইকোর্টে। বাকিগুলো এনবিআরের অধীনে আপিল ও ট্রাইব্যুনাল আদালতে। কিছু মামলা রয়েছে নতুন চালু হওয়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরে। জানা গেছে, ২৪ হাজার মামলার মধ্যে বেশিরভাগই ছোট ছোট। বড় মামলার সংখ্যা শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ। তবে বড় মামলার বিপরীতে বেশি রাজস্ব আটকে রয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু মামলা রয়েছে যা এক যুগের বেশি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে আছে।
জানা গেছে, মামলাগুলো কীভাবে দ্রুত শেষ করা যায়, সে বিষয়ে শিগগিরই আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সঙ্গে বৈঠক করবে এনবিআর। রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির জন্য বর্তমানে হাইকোর্টে ‘নির্দিষ্ট’ দুটি বেঞ্চ আছে। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে বেঞ্চ সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এনবিআরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। শুধু রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে আরও বেঞ্চ বাড়ানো যায় কি-না সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।’ যোগাযোগ করা হলে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি নাসির হোসেন সমকালকে বলেন, এডিআর ঠিকমতো কাজ করছে না। এটিকে আরও কার্যকর করতে হবে। তা হলে করদাতা, ব্যবসায়ীসহ সকলেই এডিআরের প্রতি আগ্রহী হবেন। ফলে মামলার জট কমে আসবে।

এনবিআরের অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে বেঞ্চ সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

পাশাপাশি সরকারের পক্ষ হয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও এনবিআরকে আরও তৎপর হতে হবে। এনবিআর সূত্র জানায়, ঝুলে থাকা মামলার মধ্যে বেশিরভাগই শুল্ক-সংক্রান্ত। মোট ২৪ হাজারের মধ্যে ১৫ হাজারই কাস্টম বা শুল্ক মামলা। ভ্যাটের অনিষ্পন্ন মামলা প্রায় ৪ হাজার। আয়কর ৫ হাজার। কাস্টম মামলার বিপরীতে জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাটে ৪ হাজার কোটি টাকা ও আয়করে ৭ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, বর্তমানে এনবিআরের অধীনে রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির জন্য তিনটি স্তর আছে। প্রথম, বিভাগীয় মামলা, দ্বিতীয় আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং তৃতীয় প্রচলিত আদালত। এর বাইরে সমঝোতার ভিত্তিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সূত্র জানায়, বিভাগীয় ও ট্রাইব্যুনাল নিয়ন্ত্রণ করে এনবিআর। করদাতাদের অভিযোগ, বিভাগীয় ও ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সীমিত। কেননা, বেশিরভাগ মামলার রায় করদাতাদের বিপক্ষে যায়। ফলে রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তির জন্য এখানে আসতে করদাতাদের আগ্রহ কম। অপরদিকে, হাইকোর্টে দায়ের করা মামলার ক্ষেত্রে অধিকাংশ রায় করদাতাদের পক্ষে আসে। যে কারণে করদাতাদের বেশি আগ্রহ উচ্চ আদালতের প্রতি। এনবিআরের একটি সূত্র জানায়, রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে বেঞ্চ সংখ্যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। যে কারণে এসব মামলা নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
এডিআর কার্যকর নয় :রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে চালু করা হয়েছিল এডিআর। তিন বছর আগে চালু হওয়া নতুন এই পদ্ধতি চালুর উদ্দেশ্য হচ্ছে করদাতা ও গ্রহীতা এক সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে (সমঝোতা) মামলা নিষ্পত্তি করা। বাস্তবতা হচ্ছে এডিআর সম্পর্কে উৎসাহী নন করদাতারা। এনবিআরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলেছে, কর ফাঁকিবাজরা এডিআরে আসতে চান না। কারণ, সমঝোতার ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তি হলে তখন পাওনা কর পরিশোধ করতে হবে। ফলে তারা এডিআর থেকে হাইকোর্টে যেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে আরেকটি সূত্র বলেছে, এডিআর সম্পর্কে করদাতারা আস্থা আনতে পারেননি এনবিআর এখনও। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত জুন পর্যন্ত এডিআরে ৪৬৭ জন আবেদন করেছেন। এর মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২৫৮টি। কর আদায় হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা।
আবু কাওসার – সমকাল

You may also like...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: