ক্রিমিনাল বা ফৌজদারী মামলার ধাপ

অধিকার ও সম্পত্তির অধিকার ব্যতিত যেকোনো অপরাধ ফৌজদারি মামলার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হাঙ্গামা, ব্যক্তির জীবন হরণ, অর্থসম্পদ লুটপাট ও যৌন হয়রানির অপরাধে ফৌজদারি মামলার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এক কথায় চুরি, ডাকাতি, খুন, জখম, প্রতারণা, দস্যুতা, লুটপাট, বিস্ফোরণ, ধর্ষণ, অপহরণ, বেআইনি সমাবেশ, যৌন হয়রানি, জালিয়াতি, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান প্রভৃতি অপরাধে যেসব মামলা দায়ের করা হয় তাকে ফৌজদারি মামলা বলা হয়। এসব মামলায় আপরাধী দোষী সাব্যস্ত হলে জেল জরিমানা, যাবজ্জীবন এবং মৃত্যুদণ্ড হয়ে থাকে।

সাধারণত ফৌজদারি মামলায় দুইভাবে চিহ্নিত করা হয়, যথা :-

১. আমলযোগ্য ও
২. আমল অযোগ্য মামলা।

আবার আমলযোগ্য মামলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, যথা :-

○ একটি জি আর বা পুলিশি মামলা, অন্যটি
○ সি আর বা নালিশি মামলা।

আমলযোগ্য মামলা :-

আইন মোতাবেক কিছু অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে। এসব ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত র্কমর্কতা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে থাকেন। এসব অপরাধে যে মামলা হয় তাকে আমলযোগ্য মামলা বলা হয়।

আমল অযোগ্য মামলা :-

কিছু অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে না। অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে প্রসিকিউিশন ওয়ারেন্ট বা নন-এফআইআর মামলা আদালতে দাখিল করেন। এগুলো আমল অযোগ্য মামলা।
এ ধরনের অপরাধের মামলা কোর্টের নন-জিআর রেজিস্ট্রারভুক্ত হয়ে পরিচালিত হয় বলে এ মামলাকে নন-জিআর মামলা বলা হয়।

নালিশি বা সিআর মামলা :-

ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি গিয়েও কোর্ট ফি দিয়ে বিচার প্রার্থনা করা যায়। এ ক্ষেত্রে কার্যবিধির ২০০ ধারায় শপথ নিয়ে আবেদনের উল্টো পিঠে জবানবন্দি রেকর্ড করতে হয়।
কোর্ট রেজিস্ট্রার মামলা নথিভুক্ত করে পরিচালিত হওয়ার কারণে এগুলোকে সিআর মামলা বলা হয়।

পুলিশি মামলা :-

থানার ভারপ্রাপ্ত র্কমর্কতার কাছে এজাহার দায়েরের মাধ্যমে যে মামলা শুরু হয় তাই পুলিশি মামলা নামে পরিচিত। পুলিশি মামলাকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হলো জিআর ও নন জিআর মামলা।

জিআর মামলা :-

কোন আমলযোগ্য অপরাধ ঘটার খবর পেলে থানার ভারপ্রাপ্ত র্কমর্কতা কার্যবিধির ১৫৪ ধারা অনুসারে মামলা করে আদালতে এফআইআর দাখিল করে কার্যবিধির ১৫৬ ধারা অনুসারে মামলার তদন্ত শুরু করেন।
এটাই জিআর মামলা। থানা থেকে এফআইআর আদালতে আসার পর কোর্ট ইন্সপেক্টর/সাব-ইন্সপেক্টর বা জিআর, জেনারেল রেজিস্ট্রার অফিসার উক্ত এফআইআরটি মামলা হিসেবে কোর্টের জেনারেল রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি করে তা দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের নজরে আনেন।

নন জিআর মামলা :-

আমলযোগ্য মামলা সংঘটিত হওয়ার সংবাদ পেলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেটিকে এজাহার হিসেবে গণ্য না করে পুলিশি প্রবিধান ৩৭৭ অনুসারে জিডি এন্ট্রি করে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে আদালতে নন-এফআইআর প্রসিকিউশন রিপোর্ট দায়ের করতে পারেন। এগুলো নন-জিআর মামলা নামে পরিচিত।

ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে কোন অভিযোগ আমলে নেওয়া হলে মামলা নিষ্পত্তি পর্যন্ত যে কয়টি ধাপ রয়েছে তার কিছু ধারনা পর্যায়ক্রমে দেয়া হল  :-

১. সমন :- আসামী দের বিরুদ্ধে আদালত স্বাক্ষরিত সমন ইস্যু করা হয়। যেখানে আদালতে হাজির হবার জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ থাকে।

২. ওয়ারেন্ট :- সমনে উল্লেখিত তারিখে আসামী হাজির না হলে আদালত তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেন। এরূপ প্রসেস কে W/A বা Warrant of Arrest বলা হয়।

৩. WP & A :- ওয়ারেন্ট এ উল্লেখিত তারিখে আসামীকে হাজির করা না গেলে বা আসামী পলাতক থাকলে আদালত তার বিরুদ্ধে WP & A (Warrant of Proclamation and Attachment) ইস্যু করেন।এটি ‘হুলিয়া’ বলে পরিচিত।

৪. পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি :- WP & A এতে উল্লেখিত তারিখে আসামীকে হাজির করা না গেলে বা আসামী পলাতক থাকলে এবং আদালত তার বিরুদ্ধে দুটি বহুল প্রচলিত বাংলা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রদানের আদেশ দেন।

৫. অনুপস্থিতিতে বিচার :-  পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রদানের পরও উল্লেখিত তারিখে আসামী হাজির না হলে বা আসামী পলাতক থাকলে তার অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু হয়। একে আইনের ভাষায় (Trial In Absentia) বলে।

৬. চার্জ শুনানী :- উপরোক্ত কোন প্রকৃয়ায় বা স্বেচ্ছায় অভিযুক্ত ব্যক্তি হাজির হলে আদালত তাদের উপর আনীত অভিযোগ তাদের কে পড়ে শোনাবেন। তাদের বিরূদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করলে আদালত তার জন্য তাদের কে শাস্তি প্রদান করবেন।
অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করলে উহার সত্যতা নিরূপনের জন্য সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহনের নিমিত্তে সাক্ষীদের প্রতি সমন এবং ক্ষেত্র বিশেষে অনান্য প্রসেস

যেমন :-
WW বা witness warrant এবং NWW বা Non Bailable Witness Warrant ইস্যু করা হয়।
তবে চার্জ শুনানীতে যদি আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আসামীদের বিরূদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা নাই তাহলে বিচারে না গিয়ে আসামী/আসামীদের কে অব্যাহতি দেয়া হয়।

৭. সাক্ষ্য গ্রহন :- এই পর্যায়ে ফরিয়াদী পক্ষের আইনজীবী ফরিয়াদী সহ তার মনোনীত সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহন করেন এবং আসামী পক্ষ তাদের জেরা করেন।
সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহন সমাপ্ত হলে আদালত উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শ্রবণ পূর্বক রায় ঘোষনার জন্য তারিখ ঘোষনা করেন।

৮. রায় প্রদান :- সাক্ষীদের সাক্ষ্য, নথিস্থ কাগজাত ও অনান্য পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষন করে আদালতের নিকট সন্দেহাতীত ভাবে আসামীদেরে বিরূদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুসারে শাস্তি প্রদান করেন কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলে খালাস প্রদান করেন।

৯. আপীল :- কোন পক্ষ আদালতের প্রদত্ত রায়ে সন্তুষ্ট না হলে এখতিয়ার সম্পন্ন উচ্চ আদালতে আপীল করতে পারেন।

Law Help Bangladesh

This is a common profile to post random articles form net and other sources, generally we provide original author’s information if found, but some times we might miss.
Please inform us if we missed any or if you are aggrieved on any post, we will remove or re-post it with your permission.

You may also like...

error: Content is protected !!