নতুন শ্রম আইন আগেরটির চেয়েও জঘণ্য

২০০৬ এর শ্রম আইনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধনী এনে সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলো শ্রম আইন ২০১৩. আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বাংলাদেশি পণ্যের ক্রেতা বড় বিদেশি সরকারগুলো এবং দেশের মধ্যে শ্রমিক সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। আইন প্রণয়ন শেষে দেখা যাচ্ছে সাধারণ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও শ্রমিক শ্রেণীর মূল দাবিগুলোর প্রতি সরকার খুব একটা নজর দেয়নি। এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে শ্রমিকের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়। শ্রম বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতারাও আইনটি প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছেন, সভা সমাবেশ করেছেন। তাদের বক্তব্য এই আইন আগের আইনের চেয়ে জঘণ্য হয়েছে। মালিকপক্ষ প্রথম দিকে এই সংশোধনী নিয়ে সোচ্চার থাকলেও এখন তাদের নীরবতা প্রমাণ করে তাদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে। সংশোধনী নিয়ে তারই ধারাবাহিকতায় সরকারও নিশ্চুপ।

মূল যেসব পরিবর্তন এলো

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তৈরি এ আইনটির সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি টিসিসিতে (ট্রাইপাট্রিয়াট কনসালটেশন কমিটি) উপস্থাপন করা হয়। যেখানে শ্রমিক, মালিকসহ সরকারের সমান সংখ্যক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। টিসিসিতে উপস্থাপনের পর কোনো রকম সময়ক্ষেপণের নিয়ম না থাকলেও মালিকপক্ষের অনুরোধে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল আইনটি সংশোধনের পরবর্তী সব পদক্ষেপ। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় এই আইন পাস হলো। এতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন না এলেও শ্রমিকদের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির কিছু চেষ্টা রয়েছে।
শ্রমিক-মালিকের যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি (সিবিএ) এবং ট্রেড ইউনিয়নের বিধান, ট্রেড ইউনিয়ন না করতে পারলে বিকল্প হিসেবে অংশীদারিত্বমূলক কমিটি করার বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান আইনে ট্রেড ইউনিয়নের নামের তালিকা মালিক পক্ষকে সরবরাহ করতে হতো, তবে নতুন আইন পাস হওয়ার পর নামের তালিকা মালিক পক্ষকে দিতে হবে না। সিবিএগুলো বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিতে পারার বিধান যোগ করা হয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১০০ জন শ্রমিক রয়েছে সে সব প্রতিষ্ঠানে বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রমিকের বীমা দাবির টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজ উদ্যোগে আদায় করবে এবং কোনো কারণে শ্রমিক যদি মারা যায় বা তার মৃত্যু হয় তাহলে তার পোষ্যদের বীমা দাবির টাকা মালিকদের আদায় করে দিতে হবে। ৯০ দিনের মধ্যে বীমা নিষ্পত্তির বিধানও রাখা হয়েছে। কোনো শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ ১২ বছর হলে একমাসের মজুরির সমান এবং ১২ বছরের বেশি হলে দেড় মাসের মজুরির সমান গ্রাচুইটি পাবেন। আইনে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেয়ার সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে। মজুরি কাঠামো আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে।
শ্রমিকরা যে পরিবেশে কাজ করবে সেই পরিবেশের জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধকতা ছাড়া বহির্গমন পথ ও সিঁড়ি নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে। কারখানার স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও ফ্যাক্টরি লে-আউট প্ল্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যে সকল ব্যক্তি বা প্রকৌশলী বা সংস্থা এই সব কারখানার পরিকল্পনা ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন তাদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে এবং অনুমোদনকারী সংস্থার দায় নিতে হবে।
গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল করার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল করতে আলাদা বিধিমালার বিধান রাখা হয়েছে এবং এজন্য আলাদা একটি বোর্ড গঠন করা হবে। এক্ষেত্রে সাসা হিসাব মিলিয়ে মুনাফার প্রায় ১০ শতাংশ কল্যাণ তহবিলে জমা রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে ৫ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মরত থাকলে সেখানে স্বাস্থ্যসেবার জন্য ডাক্তারসহ ক্লিনিক থাকার বাধ্যবাধকতা থাকছে এবং শ্রমিক সংখ্যা এর কম হলেও স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প ব্যবস্থা রাখার বিধান আইনে রাখা হয়েছে। এছাড়া সেফটি কমিটি গঠন ও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
আইনে কৃষকের জন্য কোনো বিধান না এলেও কৃষি শ্রমিক শব্দটি সংজ্ঞাসহ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নারী ও শিশু শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আইনে নতুন কোনো বিশেষ পরিবর্তন আসেনি।

শ্রমিকের যেসব দাবি উপেক্ষিত
শ্রমিকদের দাবি ছিল আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শ্রম আইন প্রণয়ন করতে হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে আইএলও কনভেনশনকে যথেচ্ছভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। আইএলও বা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা হলো মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে গঠিত একটি ত্রিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা। বাংলাদেশ এই সংস্থার সদস্য। এই কনভেনশন অনুযায়ী এতে স্বাক্ষরকারী সদস্য সব দেশের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ২০০৬ সালে প্রণীত শ্রম আইন অনুসারে দৈনিক ন্যূনতম শ্রম ঘণ্টা ১০ (১ ঘণ্টা বিরতিসহ) যা আইএলও কনভেনশনের পরিপন্থী। অনুমোদিত শ্রম আইনে এর কোনো সংশোধন করা হয়নি। কর্মঘণ্টা ও কর্মদিবস সুনির্দিষ্টকরণের শ্রমিকদের দাবিটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শ্রমিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এ প্রশ্নটিকে সবাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। বাংলাদেশে শ্রমিকরা প্রধানত কর্মঘণ্টার ফাঁদের মধ্যে বাস করছে। বাধ্যতামূলক শ্রম দিতে হয় তাদের অমানবিকভাবে। এক্ষেত্রে আইএলও কনভেশন অনুযায়ী ৮ ঘণ্টা শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ধরে এর মধ্যে ১ ঘণ্টা বিশ্রাম ও খাওয়ার সময় হিসেবে গণ্য করে আইনে সংশোধনী আনা দরকার ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশোধিত আইনে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও গ্রাচুইটির কথা ঘটা করে বলা হচ্ছে। ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে সংশোধনীতে নতুন বিধান এসেছে। এতে বলা হয়েছে ‘যদি কোনো শ্রমিক কোনো মালিকের অধীনে দুই বছরের বেশি কাজ করেন এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা যান, তাহলে মালিক মৃত শ্রমিকের মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাঁর কোনো পোষ্যকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। এ ক্ষেত্রে এক বছর বা ছয় মাসের বেশি সময় কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অথবা কর্মকালীন দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুর জন্য ৪৫ দিনের মজুরি অথবা গ্রাচুইটি (যা টাকার অঙ্কে বেশি আসবে) দিতে হবে। এই টাকা মৃত শ্রমিক চাকরি থেকে অবসর নিলে অবসরের যে সুবিধা পেতেন, তার অতিরিক্ত হিসেবে পাবেন।’ আবার সংশোধিত শ্রমনীতি অনুযায়ী কোনো শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ ১২ বছর হলে এক মাসের মজুরির সমান এবং ১২ বছরের বেশি হলে দেড় মাসের মজুরির সমান গ্রাচুইটি পাবেন।
এগুলো কার্যকর করার মূল সমস্যাটা হচ্ছে চাকরির নিরাপত্তা। সংশোধিত আইনে শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। আইনে বলা হয়েছে কোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলে তাকে ১৫ দিনের মজুরি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ এক বছর হতে হবে। তবে অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত হলে তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এ সংক্রান্ত ২৩ ধারার ৩ উপধারায় বলা হয়েছে ‘শৃঙ্খলা হানিকর কোনো কর্ম’ অসদাচরণ গণ্য হবে। এই ‘শৃঙ্খলা হানিকর কোনো কর্ম’ এর কোনো সংজ্ঞা আইনে নেই। মালিক নিজেই যদি এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন তাহলে যে কাউকে যে কোনো কারণে যে কোনো সময় বহিষ্কার করতে পারবেন।
আইন অনুযায়ী কোনো শ্রমিক ইস্তফা দিলে তার ৩০ দিন আগে তাকে নোটিশ দিতে হবে। বিনা নোটিশে ইস্তফা দিলে মালিক ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাবেন। শ্রমিককে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিয়ে কাজে যোগ দিতে হবে। না দিতে পারলে মালিক তাকে বহিষ্কার করবে এবং সে কোনো সুযোগসুবিধা বা ক্ষতিপূরণ পাবে না। বাস্তবে দেখা যায়, কোনো শ্রমিক ৩০ দিন বা তারও বেশিদিন আগে চাকরি হতে ইস্তফার নোটিশ দিলে, মালিকপক্ষ কর্তৃক তার লাঞ্ছিত হয়ে বরখাস্ত হওয়ার ভয় থাকে। তাই তারা না বলেই কাজ ত্যাগ করে। কোনো সুযোগসুবিধার কথা চিন্তাও করে না।
এভাবে ছাঁটাইয়ের সুযোগ রেখে এবং সার্ভিস বেনিফিট বাতিল হওয়ার বিধান রেখেই আইন সংশোধন করা হয়েছে। যার ফলে যেসব সুযোগসুবিধার কথা বলা হচ্ছে তার কিছুই আসলে শ্রমিক পাবে না। একজন শ্রমিকের পক্ষে কোনো মালিকের অধীনে ৬ মাস, বড়জোর এক বা দুই বছরের বেশি চাকরি করা হয়ে উঠে না। তাই কোনো সুযোগসুবিধা সে পাবে না। আবার এক কোম্পানিতে কষ্ট করে ১৫ বছর থাকলেও মালিক যে কোনো দিন তাকে বহিষ্কার করলে কোনো সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষতিপূরণের জন্য শ্রমিক কখনো আদালতমুখীও হয় না। কারণ তার মামলা করার সামর্থ্য যেমন নাই তেমনি মামলা করে খুব বেশি কিছু পাওয়ার আশাও থাকে না। পাশাপাশি দিনের পর দিন শ্রম আদালতে মামলা আটকে থাকার ব্যাপার তো আছেই।
এই আইনে মালিকের সুবিধা আরও নিশ্চিত করা হয়েছে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের বিধান করে। জরুরি কাজে বা অপরিহার্য কারণবশত মালিকপক্ষ চাইলে যেসব ক্ষেত্রে স্থায়ী শ্রমিক লাগে সেখানে চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ী ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ দিতে পারবে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা নিয়োগ পাবে ঠিকা হিসেবে এবং স্থায়ী হিসেবেই তারা চাকরি করতে থাকবে। যখনই সুযোগসুবিধার প্রশ্ন উঠবে তখনই তাদের মেয়াদ শেষ বলে ঘোষণা দিবে মালিক।
এই আইনে শ্রমিকের বাসস্থান সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। বরং মজুরির সংজ্ঞা (ধারা ২/৪৫) থেকে বাড়ি ভাড়া বাদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ছুটিতে থাকাবস্থায় শ্রমিক বাড়ি ভাড়া থেকে বঞ্চিত হবেন বলা হয়েছে। আইনের এই পরিবর্তনের ফলে মজুরি বোর্ড কর্তৃক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণকালে বাড়ি ভাড়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা সম্ভব হবে না।

ট্রেড ইউনিয়ন বিতর্ক
ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের প্রশ্নটি এবার বহুল আলোচিত হলেও এক্ষেত্রে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে তা যথেষ্ট মনে করছেন না শ্রমিকরা। বরং শ্রমিক নেতারা অভিযোগ তুলেছেন সংশোধিত আইনে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নেই, সেখানে এই ইউনিয়ন গঠন না হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক (পার্টিসিপেটরি) কমিটিই ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে গণ্য হবে (ধারা ২০৫) এই ইউনিয়নই যৌথ দরকষাকষি কার্যক্রম (সিবিএ) পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। ফলে অংশগ্রহণমূলক কমিটি বা এরূপ মালিক ও মালিকের আস্থাভাজন শ্রমিকের সমন্বয়ে যে অংশগ্রহণমূলক কমিটি রয়ে যাবে বৈধ ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প রূপে। ট্রেড ইউনিয়ন আর গড়ে তোলা হবে না। যদিও বাংলাদেশের আইন এবং আইনও কনভেনশনে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের শ্রম আইনেও ট্রেড ইউনিয়নের বিধান ছিল। কিন্তু আট বছরে হাতে গোনা ২/৩ টি ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়া কোথায় কোনো ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠেনি। অথচ মোট গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা ৪৭০০ এর অধিক। ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সংশোধিত শ্রমনীতিতে পরিবর্তন যা এসেছে সেটা হলো আগের নিয়মে ট্রেড ইউনিয়নের শ্রমিকের তালিকা মালিক পক্ষকে সরবরাহ করার বিধান ছিল বর্তমান আইনে এটা তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই তালিকা যে মালিক পক্ষের সংগ্রহের বাইরে থাকবে বিষয়টি এমন নয়। তারা সহজেই শ্রম পরিচালক বা রেজিস্টার অফ ট্রেড ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে এই তালিকা সংগ্রহ করে নিতে পারবে। এবং সেই তালিকা অনুযায়ী কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে বহিষ্কার করা হলে শ্রমিকদের আবার ট্রেড ইউনিয়নের তালিকা করতে বসতে হবে।
আইনে এ সংক্রান্ত ইতিবাচক কিছু বিষয় যোগ হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের সময়কাল দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে। এ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হবে, ওই প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমশক্তি বা সদস্যের ২০ শতাংশ নারী থাকলে ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটিতে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে অংশগ্রহণকারী কমিটিতে শ্রমিকপক্ষের নির্বাচিত বা মনোনীত কর্মকর্তা ও সদস্যদের কমিটির মেয়াদকালে তাদের সম্মতি ছাড়া মালিক বদলি করতে পারবেন না। অংশগ্রহণকারী কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধিদের কমিটির দায়িত্বসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার সময় সরল বিশ্বাসে সম্পাদিত কাজের জন্য মালিক তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনতে পারবেন না। এ ছাড়া সংশোধনীতে প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে ‘দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন’-এর পরিবর্তে ‘পাঁচ বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন’ থাকার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি সম্পর্কে এই আইনে যা বলা হয়েছে তাতে শ্রমিক নতুন করে সঙ্কটে পড়বে। শ্রমিক সাধারণত যে কোনো মামলা মোকদ্দমার ক্ষেত্রে তার ইউনিয়নের উপর নির্ভর করে এবং ইউনিয়নের সাহায্য সহযোগিতা নিয়েই মামলা করে থাকে। বিদ্যমান শ্রম আইনের ২২০ ধারা অনুযায়ী আইনজীবীদের পাশাপাশি ‘ক্ষমতা প্রাপ্ত’ প্রতিনিধিকে মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদিত সংশোধনীতে (ধারা ২২০) এই ক্ষমতা কর্তন করে শ্রমিক, শ্রমিকশ্রেণী ও তাদের ইউনিয়নের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। শ্রম আইনে ইপিজেড-এ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ছিল না। এবারও সেখানে কোনো সংশোধনী আসেনি।

মালিকের লাভ ক্ষতির হিসাব
সংশোধিত আইন অনুযায়ী মালিকরা বেশি লাভবান হয়েছেন বলে শ্রমিকদের দাবি। কিন্তু মালিকরা তা মানতে নারাজ। বর্তমান আইনে ট্রেড ইউনিয়নের নামের তালিকা মালিকপক্ষকে সরবরাহ করতে হতো। যা বাতিল করা হয়েছে। মালিকপক্ষ মনে করেন, এতে সমস্যা তৈরি হবে। সংশোধনীতে কোনো কারখানায় পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করলে তাঁদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্লিনিক থাকার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। শ্রমিকের সংখ্যা কম হলে স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এটা করা কঠিন হবে বলে মালিকরা জানিয়েছেন।
সংশোধিত আইনে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ১০০ জন শ্রমিক রয়েছেন, তাদের জন্য গ্রুপ বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রমিকদের বিমা দাবির টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নিজ উদ্যোগে আদায় করতে হবে। কোনো কারণে শ্রমিক মারা গেলে তার পোষ্যদের ওই বীমার টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা আদায় করে দেবেন। এছাড়া শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেয়ার সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে। মালিকরা মনে করেন, এটা বাড়াবাড়ি।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, যদি কোনো শ্রমিক কোনো মালিকের অধীনে দুই বছরের বেশি কাজ করেন এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা যান, তাহলে মালিক মৃত শ্রমিকের মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাঁর কোনো পোষ্যকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। এ ক্ষেত্রে এক বছর বা ছয় মাসের বেশি সময় কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অথবা কর্মকালীন দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুর জন্য ৪৫ দিনের মজুরি অথবা গ্রাচুইটি (যা টাকার অঙ্কে বেশি আসবে) দিতে হবে। এই টাকা মৃত শ্রমিক চাকরি থেকে অবসর নিলে অবসরের যে সুবিধা পেতেন, তার অতিরিক্ত হিসেবে পাবেন। এই ধারাটি নিয়েও মালিকরা বিরক্ত।
তবে সব দিক থেকে বিবেচনা করলে এই আইনে মালিকরা লাভবান হয়েছে বলা যায়। আইনে মালিকদের সর্বোচ্চ সুবিধার বিধান লক্ষ্য করা যায়। আইনটিতে বলা আছে, যে কোনো মালিক শ্রমিকদের দাবি দাওয়ার মুখে যে কোনো সময়ে বিনা পারিশ্রমিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দিতে পারবে। এই বিধান বাতিলের দাবি ছিল শ্রমিকদের। কিন্তু ধারাটি বহাল আছে।
গ্রাচুইটি ও বীমার টাকা মালিক কর্তৃক পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকেও মালিকরা লাভবান হবেন। অনেক শ্রমিকই এগুলোর দাবি করতে আসবেন না। বা আসলেও সহজে তাদের ফিরিয়ে দেয়া যাবে। ৫ শতাংশ মুনাফা শ্রমিক কল্যাণের জন্য রাখার আগের বিধান পোশাকশিল্পের জন্য বাতিল করা হয়েছে। ক্রেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে এক্ষেত্রে একটি তহবিল গঠনের কথা বলা থাকলেও তা আদতে মুখ দেখবে কিনা অনেকের সন্দেহ। দেখলেও বিদেশি ক্রেতাদের টাকা এখানে জমা পড়বে। যা আবার মালিকরাই ব্যয়ের খাত দেখিয়ে শেষ করবেন।
অসদাচরণের দায়ে শ্রমিকদের বহিষ্কার করার বিধানও মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেবে। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য দাবি পিছিয়ে পড়ায়ও লাভবান হয়েছেন মালিকরা। শিশুশ্রম সম্পর্কে নতুন সংশোধনীতে কোনো কথা বলা হয়নি।
আইন না মানার দায় ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে বিরক্ত মালিকরা। তাদের দাবি, নতুন প্রস্তাবনায় জরিমানা বর্তমানের তুলনায় পাঁচ গুণ বাড়ানোর পাশাপাশি দণ্ডারোপ করা হয়েছে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া কারখানা পরিচালনা করেন মহাব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপক। সুতরাং আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তার দায় তাদের ওপর বর্তায়, মালিকের ওপর নয়। সুতরাং মালিককে কোনোভাবেই দণ্ড দেয়া ঠিক হবে না। পাশাপাশি তাদের জোর দাবি রয়েছে, কারখানা পরিদর্শক নোটিশ দিয়ে কারখানায় আসতে হবে। নিরাপত্তা প্রহরী বা পরিদর্শনের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কোনো ব্যক্তির বাধা দেওয়া বা অন্য কোনো আচরণকে আইনের নির্ধারিত বাধা বলে গণ্য করা যাবে না। মালিককে অযথা হয়রানি বা বেকায়দায় ফেলার জন্য বা অবৈধ সুবিধা আদায়ের জন্য পরিদর্শন করছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

কৃষক উপেক্ষিত আগের মতোই
শ্রম আইনে এবারও বিশেষ কোনো সুবিধা পায়নি দেশের সবচেয়ে বড় অংশ কৃষকশ্রেণী। এই আইনে শুধু কৃষি শ্রমিকের একটি সংজ্ঞা যোগ করা হয়েছে যাতে কৃষকের কিছুই যায় আসে না। আইনে বলা হয়েছে, ‘কৃষি শ্রমিক’ বলতে বোঝাবে যিনি দৈনিক, মাসিক অথবা বার্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে অথবা নির্দিষ্ট কোনো কাজ সম্পাদনের চুক্তিতে মজুরির বিনিময়ে বিভিন্ন প্রকার শস্য, শাকসবজি, ফল, নানা রকম গাছগাছালি চাষ এবং গবাদিপশু ও মৎস্য উৎপাদন এবং অন্যান্য কৃষিজ উৎপাদনে নিযুক্ত থাকেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন আমাদের দেশে কৃষি খাতের কর্মপরিধি ব্যাপক। এ খাতে নিয়োজিতদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে অভিহিত করে আইনি কাঠামোর মধ্যে দায়সারাভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেনতেনভাবে একটি সংজ্ঞা দিয়ে তাদের দায়দায়িত্ব, অভাব-অভিযোগ ও মালিকের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ভিত্তি, মজুরি, ক্ষতিপূরণ, ছুটি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত কিছু আলোকপাত করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি শ্রমিকদের জন্য পৃথক একটি আইন অথবা শ্রম আইনের মধ্যেই আলাদা অধ্যায়ে কৃষি শ্রমিকের সার্বিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা জরুরি। কৃষি শ্রমিক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, তাদের দৈনিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে নিয়োজিত কৃষি শ্রমিকের মজুরি-ভাতাদি, দায়দায়িত্ব, ছুটিসহ যাবতীয় বিষয় নির্ধারণ করে প্রস্তাবিত আইনে সংযোজন করা আবশ্যক।

উপেক্ষার তালিকা আরও বড়
এই সংশোধনীতেই কথা ছিল নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ২৪ সপ্তাহ করা হবে। কিন্তু মালিকদের চাপে তা করা হয়নি। বিজিএমইএর তৎকালীন সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছিলেন, ‘এতে শ্রমিকদের ঘরে ঘরে গর্ভবতী মহিলা দেখা যাবে। জন্মহার বৃদ্ধি পাবে।’ এই অপমানজনক মন্তব্যটিকেই সরকার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। নারী শ্রমিকদের পাশাপাশি শিশুশ্রমিকরাও উপেক্ষিত হয়েছে। যদিও আইএলও কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক নানা বিধান অনুযায়ী শিশুশ্রম বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব।
আরও বঞ্চিত হয়েছেন যৌনকর্মীরা। তারা শ্রমিকের অধিকার চেয়েছিলেন। আইনগত অধিকার না থাকায় তারা নিজের সন্তানটিকে পর্যন্ত পরিচয় দিয়ে বড় করতে পারেন না। গৃহশ্রমিকরাও রয়েছেন এই আইনের আওতার বাইরে। নারী গৃহ শ্রমিকদের জন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা না থাকায় তাদের শ্রম অধিকার যেমন স্বীকৃত নয়, তেমনি তাদের অভাব-অভিযোগ, মজুরি ও ভাতা, ছুটিসহ অন্যান্য বিষয়ের আইনি সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা ২০১০ এর বাস্তবায়নেরও কোনো উদ্যোগ নেই।

শ্রমিকশ্রেণীর নেতা মহামতি লেনিন বলেছিলেন, ‘সর্বাধিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও শ্রমিকশ্রেণীর একমাত্র পরিণতি শ্রম দাসত্ব।’ বাংলাদেশ সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ ও সঙ্কটাপন্ন একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে আইন দিয়ে শ্রমিকের মুক্তি হয়ে যাবে এমনটা কেউই মনে করেন না। তবে দেশ কাল বিশ্ব সবই এগুচ্ছে। সকলের ধারণা ছিল নতুন সংশোধিত শ্রম আইন নিশ্চয়ই শ্রমিকদের বিশেষ সুবিধা দেবে। তাদের বিকাশের পথ উন্মুক্ত করবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। আগের চেয়ে আরো কঠিন করে তোলা হলো শ্রমিকের জীবন। রাষ্ট্র মালিকের পক্ষে অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করল।

কৃতজ্ঞতায় ইস্টিশন ব্লগ (www.istishon.com)

Comments

comments

Law Help Bangladesh

This is a common profile to post random articles form net and other sources, generally we provide original author's information if found, but some times we might miss. Please inform us if we missed any or if you are aggrieved on any post, we will remove or re-post it with your permission.

You may also like...

Leave a Reply

error: Content is protected !!