হিন্দু বিবাহ;পারিবারিক আইন – পর্ব – ১

যদি প্রশ্ন করা হয় মানুষের জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র কীভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে ? এক কথায় উত্তরটা হয়তো হবে সভ্যতার নিয়মে । তাহলে কি সভ্যতার সেই ঊষাল লগ্নে আদিম মানুষেরা শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলনা ? অবশ্যই ছিল । আমার কাছে মনে হয় সভ্যতা বিনির্মাণের বিভিন্ন কালপর্বে নানা মাত্রিক জটিলতা অপসারণ করার অভিপ্রায়ে মানুষ কতোগুলো নিয়ম করেছে । বলা বাহুল্য তার প্রয়োজনে । সেই নিয়মগুলোর মধ্যে বিধিবদ্ধ আইন সাম্প্রতিকতম প্রচেষ্টা ।

এই লেখায় বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রচলিত পারিবারিক আইন বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হবে । পারিবারিক আইনের বিষয়গুলো আমাদের প্রাত্যাহিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে । সেকারণে এই বিষয়ে ধারণা থাকাটা অত্যন্ত জরুরী । এই জানা বুঝা’ টা সরাসরি আপনার আমার কাজে নাও লাগতে পারে কিন্তু যারা সমাজের অসহায়, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত তাদের কাজে নিশ্চই লাগবে । আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কেবল আইন না জানার কারণে অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন সময়ে বঞ্চিত, প্রতারিত হচ্ছে । এই রাষ্ট্র এবং সেই সাথে কতিপয় বেসরকারি আইন সহয়তা প্রতিষ্ঠান যে যৎসামান্য আইনী সুবিধা প্রদান করে থাকে তাও ওই প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে সেভাবে পৌছায় না । আর আইন তো ধরেই নেয় আপনি আইন জানেন । সুতরাং না জানাটা কোন রক্ষাকবচ নয় ।

হিন্দু বিয়ে
হিন্দু বিয়ে @

মুসলিম বিয়ের মতো হিন্দু বিয়ে কোন চুক্তি নয় । হিন্দু বিয়ে এই অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র । অর্থাৎ হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রে বিয়ের ক্ষেত্রে যেসব বিধি – বিধান অনুসরণ করার কথা বলা আছে তার বাইরে কিছু নয় । সংস্কারের নিগড়ে আবদ্ধ এই বিয়েকেই বলা হচ্ছে নারী – পুরুষের পবিত্র বন্ধন । এবং এই সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য ।

হিন্দু বিয়ের প্রকারভেদ

শাস্ত্রমতে প্রাচীনকালে ধরণের হিন্দু বিয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় । এর মধ্যে দুটি ভাগের সাক্ষাৎ মেলে । যেমন – ১। অনুমোদিত বিয়ে , ২। অননুমোদিত বিয়ে ।

* অনুমোদিত বিয়ে –
ক) ব্রাহ্ম বিয়ে
খ) দৈব বিয়ে
গ) আর্য বিয়ে
ঘ) প্রজাপাত্য বিয়ে

* অননুমোদিত বিয়ে –

ক) গান্ধর্ব বিয়ে
খ) আসুর বিয়ে
গ) রাক্ষস বিয়ে
ঘ) পৈশাচ বিয়ে

বর্তমানে ব্রাহ্ম ও আসুর প্রথায় বিয়ে ব্যতীত বাকি সব প্রথা অচল বলা যায় । এছাড়া কালেভদ্রে গান্ধর্ব মতে কোথাও কোথাও বিয়ে অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় ।

# ব্রাহ্ম বিয়ে

এই প্রথা অনুসারে কন্যার পিতা কোন বেদজ্ঞ ( বেদ সম্পর্কে যার পূর্ণ জ্ঞান আছে ) সচ্চরিত্র ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ করে এনে বিভিন্ন ধরণের উপহার সামগ্রীসহ মেয়েকে পাত্রের কাছে সম্প্রদান করতেন । এই রীতির বিয়ে পূর্বে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ছিলো । বর্তমানে বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষিত হিন্দুর মধ্যে এই প্রথায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । এই বিয়েকে প্রচলিত মতে ‘ দানে বিয়ে ’বলা হয় । অর্থাৎ যে বিয়েতে কন্যাকে যৌতুক সমেত পাত্রস্থ করা হয় ।

# আসুর বিয়ে

এই ধরণের বিয়েতে কনের পিতা পাত্রপক্ষের কাছে কন্যার মূল্য দাবী করেন । পাত্রপক্ষ দাবীকৃত মুল্যে অর্থাৎ যৌতুকে সম্মত হলে কন্যাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে পারেন । এখনো দরিদ্র ও অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রকারের বিয়ে প্রচলিত আছে ।

হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ এ ভিলেজ উইদাউট উইমেন ’ এ বাপসহ পাঁচ পুত্র একজন মেয়েকে বিয়ে করে ‘ আসুর প্রথা ’ মতে ।
যেহেতু যৌতুক বা পণ গ্রহণ করে পিতা তার কন্যাকে পাত্রের নিকট সম্প্রদান করেন তাই এই বিয়েকে প্রচলিত অর্থে ‘ পণে বিয়ে ’ বলে থাকে ।

# গান্ধর্ব বিয়ে

একে সহজ বাংলায় লাভ ম্যারেজ বলা যায় । এই বিয়েতে কোন পুরোহিতের প্রয়োজন পড়ে না । তরুণ – তরুনী প্রণয়ে সিক্ত হয়ে গান্ধর্ব মতে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয় । একারণে, হিন্দু বিয়ের প্রচলিত নিয়ম – কানুন, আচার মান্য করা হয় না ।

” গান্ধর্ব বিয়ে সনাতনী হিন্দু আইনের বিধান হলেও আবেদ আলী বনাম রাষ্ট্র ( ৩৪ ডিএলআর, ১৯৮২, ৩৬৬ ) ও অমুল্য চন্দ্র বনাম রাষ্ট্র ( ৩৫ ডিএলআর, ১৯৮৩; ১৬০ ) মামলায় এই রকম বিয়েকে নিরুৎসাহিত করেছে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, যেহেতু বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে হিন্দু বিয়েতে রেজিস্ট্রেশনের বিধান নাই তাই ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত আচার – অনুষ্ঠানাদি পালন করা হলে পরবর্তীকালে বিয়েটির অস্তিত্ব নিয়ে যদি কোন প্রশ্ন দেখা দেয় তাহলে অন্তত বিয়েতে সংঘটিত এসব অনুষ্ঠানকে প্রমাণ হিসেবে সামনে আনা যাবে । সেই সাথে বিয়ের ক্ষেত্রে যে কোন পক্ষের প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনাও দূর হবে ।” ( সূত্র – পারিবারিক আইনে বাংলাদেশের নারী, পৃষ্ঠা ৬৬,আসক । )

যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ নিবন্ধনের বিধান ঐচ্ছিক রেখে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বিল-২০১২’ সংসদে পাস হয়েছে। এ আইন কার্যকর হওয়ার আগে হিন্দু ধর্মমতে অনুষ্ঠিত বিয়ে এ আইনের অধীনে নিবন্ধন করা যাবে বলেও বিধান রাখা হয়েছে।
(সূত্র- http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=f63420027bdc211e95be343… )

হিন্দু বিয়ের শর্ত –

ক) বর্ণ –
হিন্দু আইনে বিয়ের ক্ষেত্রে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে স্ববর্ণের নিয়ম ছিলো । নিম্ন ও উচ্চ বর্ণের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ ছিলো । তবে একজন উচ্চ বর্ণের হিন্দু পুরুষ নিম্ন বর্ণের নারীকে বিয়ে করতে পারতেন ।১৯৪৬ সালের হিন্দু বিয়ে ( অসমর্থতা দূরীকরণ ) আইন পাস হওয়ার পর বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে বাঁধা দূর হয়েছে । এখন যে কোন বর্ণের হিন্দু নারী – পুরুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন ।

খ) আচার – অনুষ্ঠান পালন –

১। যজ্ঞ বা কুশণ্ডিকা – পবিত্র আগুনের সামনে পুরোহিত কর্তৃক বর – কনে’কে বেদ মন্ত্র পাঠ করানো ।
২। সপ্তপদী – সপ্তপদী মানে পবিত্র অগ্নিকে মাঝখানে রেখে বর – কনে’কে সাতপাক ঘুরানো । একে বলে হয় সাতপাকে বাঁধা । এই সময় পুরোহিত বর – কনের মঙ্গলার্থে বেদমন্ত্র পাঠ করেন । সুখী দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব – কর্তব্য বিষয়ে পুরোহিত তাদের অঙ্গীকার করান । সাতপাকে ঘুরা সম্পন্ন হওয়া মাত্র বিবাহ আইনত সম্পন্ন হয়ে যায় ।

হিন্দু বিয়ের ক্ষেত্রে উপরোক্ত দুটি বিধান অবশ্য পালনীয় ।

গ) বয়স –
বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ ( সংশোধিত – ১৯৩৮ ) অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স ১৮ এবং ছেলের বয়স ২১ নির্ধারণ করা হয়েছে ।

এই আইন অমান্য করে কোন বাল্য বিবাহ অনুষ্ঠিত হলে যারা এই বিয়ের সাথে জড়িত অর্থাৎ পাত্র – পাত্রীর মা, বাবা, পুরোহিত সহ অন্য আরো যারা বিয়ে সংঘঠনে সহয়তা করেছেন তারা উক্ত আইনের অধীনে শাস্তি পাবেন।

ঘ) সম্মতি – বিয়েতে বর – কনের স্বাধীন সম্মতি থাকতে হবে ।

হিন্দু বিধবা বিবাহ –

হিন্দু বিধবা বিবাহ আইনের কথা আসলে অবধারিতভাবে একজন মানুষের নাম চলে আসবে । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । এই মানুষটির নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে পাস হয় ‘ বিধবা বিবাহ আইন ’। পূর্বে দেখা গেছে, ৮/৯ বছরের একজন কিশোরী হাতের মেহেদীর রং মুছে যাওয়ার আগে বিধবা হয়েছে । বাকি জীবন ওই কিশোরীর বাধ্যতামূলক সাদা থানে নিরামিষাশী কাটাতে হয়েছে ।
এই প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক ভারতীয় বাংলা ফিল্ম ” গয়নার বাক্স ” দেখতে পারেন ।

বৈধ বিবাহের সমস্ত নিয়ম বিধবা বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে । কোনভাবেই বিধবার সম্মতি ছাড়া বিয়ে হবে না ।

আগামী পর্বে ” মুসলিম বিবাহ ” নিয়ে আলোচনা থাকবে ।

You may also like...

error: Content is protected !!